আর্য যুগ
Ariya Jug in Details পরীক্ষার জন্য ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা RRB NTPC, SSC, UPSC এবং সরকারি পরীক্ষায় ভালো স্কোর করতে সহায়তা করে। আজকে ইতিহাসের একটি বিষয় আর্য যুগ সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হল যা পড়লে আর্য যুগ থেকে আসা যেকোনো প্রশ্নের উত্তর করা যাবে ।
তোমরা বিষয় টি ভালো করে পড় । আশা করি এই বিষয়টি পড়লে পুষ্যভূতি বংশের ইতিহাস সম্পর্কে তোমাদের একটি ভালো ধারনা হয়ে যাবে । এছাড়া আমাদের এখানে অন্যান্য বিষয়ের নোট্স দেওয়া আছে চাইলে দেখে নিতে পার ।
আর্যরা ও সংহিতাযুগ: উৎপত্তি, জীবনধারা ও বৈদিক সাহিত্য
আর্যদের আগমন: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকের কাছাকাছি সময়ে আর্যরা মধ্যপ্রাচ্য বা ইরান অঞ্চল থেকে একাধিক পর্যায়ে বিভিন্ন দলে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। এই আগমন একবারে নয়, বরং দু-তিন দফায় সম্পন্ন হয়েছিল। যারা বেদ রচনা করেছিল, তারা সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের আশেপাশে ভারতে উপস্থিত হয়। তবে তারও আগে কিছু আর্যগোষ্ঠী এদেশে প্রবেশ করেছিল বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা।
আর্যদের জীবনযাত্রা: যাযাবর পশুপালক সমাজ
আর্যরা যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাত্রা শুরু করে, তখন তারা কৃষির সঙ্গে পরিচিত হলেও দীর্ঘ অভিযাত্রায় তারা মূলত পশুপালননির্ভর যাযাবর জীবনযাপন করত। গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল ছিল তাদের প্রধান সম্পদ। খাদ্যতালিকায় ছিল—
মাংস
দুধ, দই ও ঘি
ছানা, ছাতু
মধু
ভারতে পৌঁছতে তাদের বহু বছর সময় লেগেছিল। এই দীর্ঘ সময় তারা স্থায়ী বসতি স্থাপন করতে পারেনি। ফলে বীজ বপন করে ফসল ফলানোর মতো অবকাশ তাদের ছিল না। কোথাও সাময়িকভাবে অবস্থান করলেও জীবনধারা ছিল সম্পূর্ণ যাযাবর।
Ariya Jug in Details

আর্যদের ইতিহাস জানার প্রধান উৎস: বেদ
প্রাচীন আর্য সমাজ সম্পর্কে জানার প্রধান ও প্রায় একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস হল বেদ। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে বৈদিক যুগের তেমন উল্লেখযোগ্য বস্তুগত নিদর্শন পাওয়া যায়নি। এই কারণে আর্যদের প্রাথমিক জীবন, সমাজব্যবস্থা ও ধর্মচিন্তা সম্পর্কে তথ্য জানতে আমাদের মূল ভরসা বৈদিক সাহিত্য।
চারটি বেদ ও তাদের গঠন
বেদ মোট চারটি—
>ঋগ্বেদ
>সামবেদ
>যজুর্বেদ
>অথর্ববেদ
প্রত্যেক বেদ আবার চারটি অংশে বিভক্ত—
>সংহিতা
>ব্রাহ্মণ
>আরণ্যক
>উপনিষদ
Ariya Jug in Details
সংহিতাগুলির বৈশিষ্ট্য
ঋগ্বেদ সংহিতা
ঋগ্বেদ সংহিতা ছন্দে রচিত। এর মূল অংশ হল সূক্ত, যা একাধিক ঋক বা মন্ত্র দিয়ে গঠিত। সূক্তগুলি আবৃত্তি ও সুরে গাওয়া হত। ‘সূক্ত’ শব্দের অর্থ— সুন্দরভাবে উচ্চারিত বাক্য।
যজুর্বেদ সংহিতা
এতে ছন্দোবদ্ধ মন্ত্রের পাশাপাশি কিছু গদ্য অংশও রয়েছে। যজ্ঞের বিধিবিধান এতে বিস্তারিতভাবে আলোচিত।
সামবেদ
সামবেদ মূলত সংগীতনির্ভর। এর সমস্ত মন্ত্রই ঋগ্বেদ সংহিতা থেকে নেওয়া, তবে সেগুলি গানের উপযোগী করে সাজানো হয়েছে।
অথর্ববেদ
অথর্ববেদ সংহিতায় ঋগ্বেদীয় সূক্ত ছাড়াও বহু নতুন মন্ত্র ও কিছু গদ্য অংশ রয়েছে। এখানে লোকায়ত বিশ্বাস, ঝাড়ফুঁক, কবচ, মাদুলি, তন্ত্রজাত আচার ও দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যার প্রতিফলন দেখা যায়।
Ariya Jug in Details
অথর্ববেদ: সমাজ ও প্রাথমিক বিজ্ঞানের দলিল
অথর্ববেদে রোগ নিরাময়, স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধির জন্য বহু প্রার্থনা পাওয়া যায়। এখানে যে সব রোগের উল্লেখ আছে, তার মধ্যে—
>তক্সন (ম্যালেরিয়া)
>যক্ষ্মা
>কৃমি রোগ
>শোথ
>গলগণ্ড
>গর্ভস্রাব
>অন্ধত্ব ইত্যাদি
রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে উদ্ভিদ ও ধাতুর ব্যবহার, কবচ ও মাদুলির কথা বলা হয়েছে। এগুলির সবই জাদুমন্ত্র নয়— এর মধ্যে অনেকটাই ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাথমিক রূপ। এই কারণেই অথর্ববেদকে প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রের সূচনাবিন্দু বলা হয়।
অথর্ববেদের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
অথর্ববেদের শেষ পর্যায়ে রচিত সূক্তগুলির সময় আর্যরা বিহারের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল অতিক্রম করে বাংলার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে পৌঁছে গিয়েছিল। তাই জলাভূমি-প্রধান এলাকার রোগব্যাধির উল্লেখ এখানে বেশি পাওয়া যায়। এই কারণে অথর্ববেদ সংহিতা—
>সেই সময়ের ভূগোল
>সমাজব্যবস্থা
>ধর্মীয় বিশ্বাস
>দৈনন্দিন আচরণ
—সব কিছুর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দলিল।
Ariya Jug in Details
রাজনৈতিক পরিবর্তন ও যুদ্ধচর্চা
অথর্ববেদ সংকলনের কিছু আগেই ছোট ছোট স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। ফলে এতে—
>রাজা
>সৈন্যদল
>যুদ্ধজয়
>অস্ত্রক্ষত ও বিষাক্ত বাণ থেকে রক্ষার প্রার্থনা
সংক্রান্ত বহু মন্ত্র রয়েছে। রাজপুরোহিতদের জন্য অথর্ববেদে পারদর্শিতা অপরিহার্য ছিল।
তপস্যা ও বৌদ্ধিক চর্চা
যজ্ঞের পাশাপাশি অথর্ববেদে তপস্যার কথাও পাওয়া যায়। মুনি ও ঋষির উল্লেখ ঋগ্বেদেও থাকলেও, অথর্ববেদ তপস্বী সমাজের ভূমিকার ওপর বিশেষ আলোকপাত করে।
বৈদিক সাহিত্য ও মৌখিক পরম্পরা
বেদ রচনার সময় আর্যরা লেখন-পাঠনে পারদর্শী ছিল না। তাই বৈদিক সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে মৌখিক ঐতিহ্যে সংরক্ষিত ছিল। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি হিসেবে বেদ প্রজন্মের পর প্রজন্মে মুখস্থ করে রাখা হত। সম্ভবত একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে সামান্য কিছু অংশ লিখিত আকার পায়।

Ariya Jug in Details
সংহিতাযুগে আর্যদের ধর্মাচরণ ও জীবনযাত্রা
ধর্মাচরণ: ঋগ্বেদের সূক্ত ও দেবতা-ভক্ত সম্পর্ক
ঋগ্বেদের অধিকাংশ মণ্ডলই নির্দিষ্ট কিছু ঋষিবংশের কবিদের রচনা। ঋগ্বেদ মোট দশটি মণ্ডলে বিভক্ত। প্রতিটি মণ্ডলের মধ্যে রয়েছে বহু সূক্ত, যেগুলি আবৃত্তি বা সুর করে গাওয়া হত। প্রতিটি সূক্ত আবার বহু ঋক বা পদের সমন্বয়ে গঠিত।
ঋগ্বেদের সূক্তগুলিকে সাধারণত চারটি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়—
প্রথম অংশ: স্তব বা প্রশস্তি
এখানে দেবতার রূপ, বেশভূষা, অলংকার, অস্ত্র, রথ ও অশ্বের বিশদ বর্ণনা দেওয়া হত। দেবতার শক্তি ও মহিমা তুলে ধরা ছিল এই অংশের মূল উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয় অংশ: প্রার্থনা
এই অংশে ভক্তরা দেবতার কাছে প্রার্থনা করত—
দীর্ঘায়ু, যশ, সন্তান, পশুসংখ্যা বৃদ্ধি, যুদ্ধজয়, শত্রুনাশ, স্বাস্থ্য, ধনসম্পদ ও পর্যাপ্ত অন্ন লাভের জন্য।
তৃতীয় অংশ: পূর্ববরদান স্মরণ
কিছু সূক্তে দেবতা পূর্বে কোন ভক্তকে কী কী বর দিয়েছেন তার উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে দেবতার দয়ার উদাহরণ তুলে ধরা হত।
চতুর্থ অংশ: হব্য ও স্তোত্র নিবেদন
এখানে দুই ধরনের বিষয় দেখা যায়—
(ক) দেবতার কৃপা লাভের বিনিময়ে ভক্ত যে সব দ্রব্য অর্পণ করত, যেমন— পুরোডাশ (যবের রুটি), গোমাংস ও মহিষের মাংস, দুধ, দই, ছানা, চরু (ক্ষীর), ঘোল, মধু, সুরা ও সোমরস।
(খ) দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য নতুন স্তোত্র রচনা অথবা আগে ব্যবহৃত শক্তিমান স্তোত্রের পুনরাবৃত্তি।
ঋষিবংশগুলির মধ্যে এক ধরনের কাব্যিক প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। যে কবির স্তোত্র দেবতাকে বেশি সন্তুষ্ট করতে পারত, তিনি অধিক যশ ও পুরস্কার লাভ করতেন।
এই সময়ে দেবতা ও ভক্তের সম্পর্ক ছিল মূলত লেনদেনভিত্তিক। ভক্ত দেবতাকে খাদ্য, পানীয় ও স্তোত্র নিবেদন করত, আর তার বিনিময়ে দেবতার কাছ থেকে ইহজীবনের সুখ, সমৃদ্ধি, বিজয় ও নিরাপত্তা প্রত্যাশা করত।
জীবনযাত্রা: পশুপালননির্ভর সমাজব্যবস্থা
সংহিতা ও ব্রাহ্মণ যুগের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আর্যদের প্রার্থনার মূল লক্ষ্য ছিল—
>পশুপালের বৃদ্ধি ও সুরক্ষা
>মানুষের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য
>পর্যাপ্ত খাদ্য
>সন্তানসংখ্যা বৃদ্ধি
এ থেকেই স্পষ্ট যে পশুপালন ছিল আর্যদের প্রধান জীবিকাভিত্তি। বেশি পশু মানে বেশি সম্পদ, আর বেশি সন্তান মানে যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী লোকবল। তাই পশুর স্বাস্থ্য ও সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন দেবতার আরাধনা করা হত।
এ ছাড়া ভূমিকম্প, খরা, বন্যা, সংক্রামক রোগ প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মানুষ ও পশুকুলকে রক্ষা করার জন্যও অসংখ্য প্রার্থনা পাওয়া যায়।
সংহিতাযুগের প্রার্থনার সারকথা ছিল—
মানুষ যেন নীরোগ, স্বাস্থ্যবান, ধনবান, পশুমান ও বিজয়ী হয়ে দীর্ঘকাল পৃথিবীতে বসবাস করতে পারে।
Ariya Jug in Details
আর্যদের দৈনন্দিন জীবন ও খাদ্যাভ্যাস
ভারতবর্ষে প্রবেশের পর আর্যদের প্রাথমিক জীবনযাত্রা সম্পর্কে আমাদের কাছে তথ্য সীমিত। সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের পরাজিত বা স্থানচ্যুত করে আর্যরা যখন উত্তর-পশ্চিম ভারতে বসতি স্থাপন করে, তখনও তাদের জীবন প্রধানত পশুচারণের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সম্ভবত প্রাগার্য জনগোষ্ঠীর কাছ থেকেই তারা ধীরে ধীরে কৃষিকাজ শিখে নিয়েছিল, অথবা কখনও বলপ্রয়োগ করে তাদের উৎপাদিত ফসল ভোগ করত।
আর্যদের নিত্য খাদ্যের মধ্যে ছিল—
>মাংস
>দুধ, দই, ঘোল, ছানা ও ঘি
>মধু
>যবের রুটি
>সুরা
এগুলির পাশাপাশি সোমরস ছিল যজ্ঞের প্রধান হব্য, যা দেবতাকে নিবেদন করা হত।
Ariya Jug in Details
বৈদিক যুগের ধর্ম, যজ্ঞ, জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি
ধর্মাচরণ ও ঋগ্বেদের বৈশিষ্ট্য
ঋগ্বেদের অধিকাংশ সূক্তই রচিত হয়েছিল বিভিন্ন ঋষিবংশের কবিদের দ্বারা। ঋগ্বেদ মোট দশটি মণ্ডলে বিভক্ত এবং প্রতিটি মণ্ডলে বহু সূক্ত সংকলিত হয়েছে। এই সূক্তগুলি মূলত আবৃত্তিযোগ্য বা গীত আকারে রচিত এবং প্রতিটি সূক্ত বহু ‘ঋক’ বা পদের সমষ্টি।
ঋগ্বেদের সূক্তগুলিকে সাধারণত চারটি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়। প্রথম অংশে দেবতাদের বাহ্যিক রূপ, অলংকার, অস্ত্র, রথ ও অশ্বের বর্ণনা পাওয়া যায়। দ্বিতীয় অংশে ভক্তরা দেবতাদের কাছে দীর্ঘায়ু, স্বাস্থ্য, ধনসম্পদ, সন্তানলাভ, পশুবৃদ্ধি ও যুদ্ধজয়ের মতো পার্থিব কল্যাণ কামনা করে। তৃতীয় অংশে দেবতারা পূর্বে কোন ভক্তকে কী কী দান করেছিলেন তার উল্লেখ রয়েছে। চতুর্থ অংশে দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য ভক্তরা যে নৈবেদ্য ও উপহার দিতেন—যেমন পুরোডাশ, দুধ, দই, ঘি, মধু, সোমরস ও পশুবলি—তার বিবরণ থাকে।
ঋষিকবিদের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতাও লক্ষ করা যায়। যার স্তোত্র দেবতাদের বেশি প্রীত করত, সমাজে তার সম্মান ও পুরস্কার বৃদ্ধি পেত। এইভাবে দেবতা ও ভক্তের সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক দেনা-পাওনার রূপ নিয়েছিল—ভক্ত উপাসনা ও নৈবেদ্য দিত, আর দেবতা দিতেন ইহজাগতিক সুখ ও সমৃদ্ধি।
জীবনযাত্রা ও জীবিকার ধরন
সংহিতা ও ব্রাহ্মণ যুগের প্রার্থনাগুলিতে পশুপালন, স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, খাদ্য ও সন্তানের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর থেকেই বোঝা যায়, পশুপালন ছিল বৈদিক আর্যদের প্রধান জীবিকা। বেশি পশু ও সন্তান মানেই শক্তিশালী সমাজ ও শত্রুর বিরুদ্ধে অধিক নিরাপত্তা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন খরা, বন্যা, ভূমিকম্প বা মহামারির হাত থেকে মানুষ ও পশুকে রক্ষা করার জন্য দেবতাদের কাছে বারবার প্রার্থনা করা হতো। সুস্থ, ধনী, বিজয়ী ও দীর্ঘজীবী হওয়াই ছিল বৈদিক জীবনের মূল লক্ষ্য।
আর্যরা ভারতবর্ষে প্রবেশের পর প্রথমে পশুচারণভিত্তিক জীবনযাপন করলেও ধীরে ধীরে তারা কৃষিকাজ শিখে নেয়। তাদের খাদ্যতালিকায় ছিল দুধ, দই, ঘি, মাংস, রুটি, মধু ও সুরা। পাশাপাশি সোমরস যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতাদের নিবেদন করা হতো। প্রাগার্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মেলামেশার ফলে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে।
Ariya Jug in Details
যজ্ঞ প্রথা ও আচার
বৈদিক যুগে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হতো খোলা ও পরিষ্কার জমিতে নির্মিত বেদিতে। তখন মন্দির বা দেবমূর্তির প্রচলন ছিল না। বেদিতে অগ্নি প্রজ্বলিত করে ঘি ও নৈবেদ্য অর্পণ করা হতো এবং মন্ত্রপাঠ বা স্তোত্রগান করা হতো।
বেদি তিন প্রকারের ছিল—আহবনীয়, গার্হপত্য ও দক্ষিণা। যজ্ঞ সাধারণত দুই ধরনের: নিত্য ও নৈমিত্তিক। অগ্নিহোত্রের মতো দৈনন্দিন ছোট যজ্ঞ ছিল নিত্য, আর বিশেষ উদ্দেশ্যে ও নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত যজ্ঞ ছিল নৈমিত্তিক।
প্রথমদিকে যজ্ঞ খুবই সরল ছিল, কারণ আর্যরা তখন ছিল যাযাবর পশুচারী জাতি। ভারতীয় উপমহাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গিয়ে যজ্ঞের রীতিতেও পরিবর্তন আসে।
সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামো
বৈদিক সমাজ ছিল মূলত পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষ দেবতাদের আধিক্য ও সামাজিক কর্তৃত্বে পুরুষের প্রাধান্য স্পষ্ট ছিল। পশুপালন, শিকার ও যুদ্ধ ছিল পুরুষদের কাজ, আর নারীরা ঘরের কাজ, সন্তান পালন, বস্ত্র বোনা ও খাদ্য প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকত। কৃষিকাজ শুরু হলে নারীরাও ক্ষেত্রসংক্রান্ত কাজে কিছুটা যুক্ত হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্যরা নতুন নতুন অঞ্চলে অগ্রসর হয় এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে এসে সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। বিভিন্ন শিল্পকলা—ধাতু, মাটি, কাঠ ও চামড়ার কাজ—উন্নত হতে থাকে। পেশার সংখ্যা বাড়লেও নারীর স্বাধীনতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
পরাজিত আদিবাসীরা দাসে পরিণত হয় এবং সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে লৌকিক উৎসব, নাচ, গান ও বিনোদনের চর্চাও চলতে থাকে। পরিবারব্যবস্থা ছিল দৃঢ়, যদিও সমাজে অবৈধ সম্পর্ক, গণিকাবৃত্তি ও নানা সামাজিক অপরাধের উল্লেখ ঋগ্বেদেই পাওয়া যায়।
Ariya Jug in Details
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সম্পদের ধারণা
বৈদিক যুগের মধ্যভাগেই সমাজে অল্পসংখ্যক ধনী ও বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের অস্তিত্ব দেখা যায়। গরু ছিল প্রধান সম্পদের প্রতীক, তাই যার গরু বেশি সে ছিল ধনী। গরুচুরি ও ধনের জন্য দেবতাদের কাছে প্রার্থনা ছিল অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। দেবতাদের পূর্বে দান করা সম্পদের উদাহরণ টেনে নতুন করে ধন কামনার যে স্তোত্র রচনা করা হতো, তাকে বলা হয় দানস্তুতি।
বৈদিক যুগে জীবনদর্শন, মৃত্যু ধারণা ও ধর্মচেতনা
জীবন সম্পর্কে বৈদিক মানুষের ধারণা
নতুন নতুন অঞ্চল জয় করে আর্যরা যখন দেখল যে পশুপালন ও কৃষিকাজের মাধ্যমে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন সম্ভব, তখন বৈদিক ঋষিদের জীবনে এক ধরনের তৃপ্তি ও আনন্দ লক্ষ্য করা যায়। ঋগ্বেদের বহু সূক্তে তাঁরা এই পৃথিবীতেই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন এবং প্রতিদিন নতুন সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য কামনা করেছেন।
ঋগ্বেদের প্রাচীন অংশে স্বর্গ, নরক বা পরলোক সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। বৈদিক মানুষের কাছে জীবন মূলত সুখময় ও উপভোগ্য। যে ব্যক্তি অকালমৃত্যুর শিকার হতো, তার প্রতি ছিল সমবেদনা—ধরা হতো সে অন্ধকারময় এক অজানা দেশে চলে গেল। মৃত্যু নিয়ে আতঙ্ক অতটা না থাকলেও মৃত্যুর পরে মানুষের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে এক ধরনের উদ্বেগ অবশ্যই ছিল।
Ariya Jug in Details
যম, মৃত্যু ও পরলোক ভাবনা
এই উদ্বেগ থেকেই যমকে কল্পনা করা হয় মৃতদের অধিপতি হিসেবে—তিনি মৃত্যুর দেবতা নন, বরং পরলোকের পথপ্রদর্শক। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের সূক্তগুলিতে যমের উদ্দেশে প্রার্থনা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—তিনি যেন মৃত আত্মীয়কে অজানা জগতে পথ চিনিয়ে দেন, তার দেখভাল করেন এবং স্নেহের সঙ্গে গ্রহণ করেন।
বৈদিক সমাজে মৃতের সঙ্গে স্ত্রীর সহমরণ প্রথা প্রচলিত ছিল না। বরং সদ্য বিধবাকে পুনর্বিবাহ করে সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে জীবন এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মৃতদেহ সাধারণত দাহ করা হতো, যদিও কোথাও কোথাও সমাধির নিদর্শনও পাওয়া যায়। সংহিতা সাহিত্যে শ্রাদ্ধের উল্লেখ না থাকলেও পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে, বিশেষ করে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকের পর থেকে, শ্রাদ্ধ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার হয়ে ওঠে।
পিতৃপুরুষ ও অতিলৌকিক সত্তা
মৃত পূর্বপুরুষদের বলা হতো ‘পিতরঃ’। তাঁদের উদ্দেশেও বিশেষ কিছু আচার অনুষ্ঠিত হতো। বিবাহ বা অন্যান্য শুভকর্মের আগে পিতৃপুরুষদের সন্তুষ্ট করার রীতি তখনও ছিল। ধীরে ধীরে ‘পিতরঃ’ প্রায় দেবতুল্য মর্যাদা লাভ করেন এবং পিতৃক্রিয়া বৈদিক ধর্মাচরণের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে।
বৈদিক কল্পনাজগতে এক বিস্তৃত অতিলৌকিক শ্রেণিবিন্যাস গড়ে ওঠে। সর্বোচ্চ স্থানে দেবতারা, তার নিচে পিতরঃ, তার পর যক্ষ, গন্ধর্ব, কিন্নর ও অপ্সরাদের মতো উপদেবতা। মানুষের নিচে অবস্থান করত রাক্ষস, অসুর, পিশাচ, দৈত্য ও দানবরা—এদের শক্তি মানুষের চেয়ে বেশি হলেও এরা ছিল অশুভ শক্তির প্রতীক। ধারণা করা হয়, প্রাগার্য অধিবাসীদের হীন প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই প্রথমে ‘অসুর’ ধারণার ব্যবহার শুরু হয়েছিল।
Ariya Jug in Details
প্রেতাত্মা, রোগব্যাধি ও লোকবিশ্বাস
পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে প্রেতাত্মার ধারণা স্পষ্ট হয়। অতৃপ্ত মৃত আত্মাদের প্রেত বলে কল্পনা করা হতো, যাদের কাজ ছিল মানুষের ক্ষতি করা। অথর্ববেদে বহু রোগব্যাধির কারণ হিসেবে প্রেতাত্মা বা অশুভ আত্মার উল্লেখ আছে। তবে এসব বিপদ থেকে রক্ষার জন্য নানা প্রতিকারও বর্ণিত হয়েছে—মন্ত্র, কবচ, মাদুলি ও বিশেষ আচার।
এই আচারগুলির সঙ্গে অনেক সময় ভেষজ গুণসম্পন্ন গাছগাছালি ও ধাতুর ব্যবহার যুক্ত ছিল। সমাজে পুরোহিতদের পাশাপাশি ওঝাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পুরোহিতরা দেবতাকে আহ্বান করে যজ্ঞের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণ কামনা করতেন, আর ওঝারা ঝাড়ফুঁক ও মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে সরাসরি অতিপ্রাকৃত শক্তিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করত। মানব ইতিহাসে ওঝাদের অস্তিত্ব সম্ভবত পুরোহিতদের থেকেও প্রাচীন।
Ariya Jug in Details
ধর্মের বিকাশ ও যজ্ঞব্যবস্থার জটিলতা
সমাজে যখন বারবার দুর্যোগ দেখা দিত—মহামারী, বন্যা, খরা, ভূমিকম্প বা শত্রুর আক্রমণ—তখন নতুন নতুন দেবতার কল্পনা গড়ে উঠত। এর সঙ্গে সঙ্গে যজ্ঞ ক্রমে দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। যজ্ঞের দক্ষিণার পরিমাণ ও সামগ্রীর তালিকাও বেড়ে যেতে থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে যজ্ঞ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে এবং পুরোহিতশ্রেণির ক্ষমতা ও লোভ উভয়ই বৃদ্ধি পায়।
বৈদিক সংহিতা যুগের সমাজচিত্র
সংহিতা যুগের সমাজে এক সুস্পষ্ট স্তরবিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। সর্বোচ্চে দেবতারা, তার নিচে পিতরঃ, তার পরে উপদেবতা, তারপর মানুষ এবং একেবারে নিচে অপদেবতা ও অশুভ শক্তিগুলি। এই ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যেই মানুষ তার কাম্য বস্তু লাভের উপায় এবং অকল্যাণ প্রতিরোধের পথ খুঁজে পেত।
বৈদিক যুগে ধর্ম মূলত যজ্ঞ ও ঝাড়ফুঁকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ধর্মের একটি উৎস ছিল ভয়—রোগ, মৃত্যু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শত্রুর আক্রমণের আতঙ্ক। অন্য উৎস ছিল বিস্ময়—প্রকৃতির সৌন্দর্য, ঋতুচক্র, সূর্য-চন্দ্রের গতি, জীবন ও মৃত্যুর রহস্য। এই ভয় ও বিস্ময় থেকেই দেবতার কল্পনা এবং ধর্মাচরণের সূচনা।
ঋগ্বৈদিক যুগে আর্যদের অর্থনীতি, সমাজ ও জীবনধারা
ঋগ্বৈদিক আর্যদের সম্পত্তি ও পেশা
ঋগ্বৈদিক যুগে আর্যদের প্রধান সম্পদ ছিল পশুসম্পদ। গরু, ঘোড়া, মোষ, ভেড়া ও ছাগল—এই পশুগুলিই ছিল ধনসম্পদের মাপকাঠি। পশুপালনই ছিল তাদের প্রধান পেশা। খাদ্যের জন্য তারা শিকার করত এবং যুদ্ধজয়ে পরাজিত শত্রুর সম্পত্তি লুঠ করাও তখন স্বাভাবিক বিষয় ছিল।
পাশাপাশি কিছু প্রাথমিক কুটিরশিল্পেরও প্রচলন দেখা যায়। গৃহস্থালির দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী ছাড়াও রথ নির্মাণ, সাধারণ কাঠের কাজ, চামড়ার জিনিস, কাপড় ও পশম বোনা, গয়না ও খেলনা তৈরির কাজ চলত। প্রথম দিকে আর্যরা রোদে শুকনো ইঁট দিয়ে তৈরি ঘরে বাস করত; পোড়া ইঁট ব্যবহারের জ্ঞান তারা অনেক পরে অর্জন করে।
শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংগঠন
ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদ যুগে শাসনব্যবস্থা ছিল গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। সেনাপতি, দলপতি বা গোষ্ঠীপতির হাতেই শাসনক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। সমাজ ছোট ছোট কৌম বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল।
শাসনকার্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত দুটি প্রতিষ্ঠান— সভা ও সমিতি।
- সমিতি ছিল গোষ্ঠীর সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্যদের সাধারণ সভা।
- সভা ছিল অভিজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষদের সীমিত পরিষদ।
এই দুই প্রতিষ্ঠানেই নারীদের প্রবেশাধিকার ছিল না। গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ, যুদ্ধ, শান্তি ও সামাজিক সিদ্ধান্ত এখানেই নেওয়া হতো, যদিও ঠিক কোন বিষয়ে কোন সভা সিদ্ধান্ত নিত—সে সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই।
বর্ণব্যবস্থার প্রাথমিক রূপ
যজুর্বেদ যুগে সমাজে চারটি বর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়— ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। তবে এই বর্ণবিভাগ প্রথম দিকে জন্মভিত্তিক ছিল না। ব্যক্তির যোগ্যতা, কর্ম ও প্রবৃত্তি অনুযায়ী এক বর্ণ থেকে অন্য বর্ণে পরিবর্তন সম্ভব ছিল। বেদে এমন উদাহরণও পাওয়া যায়। পরবর্তী কালে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জন্মগত ও বংশানুক্রমিক রূপ নেয়।
Ariya Jug in Details
পারিবারিক জীবন ও সামাজিক কাঠামো
বড় যৌথ পরিবারকে বলা হতো কুল। একটি কুলে তিন বা চার প্রজন্মের মানুষ একসঙ্গে বাস করত। গ্রামে বাড়িগুলি কাছাকাছি থাকত। পরিবারের পশু চরানোর জন্য আলাদা জমি থাকত, তার বাইরে ছিল গ্রামের যৌথ চারণভূমি এবং আরও দূরে বনভূমি। জমির ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না; বসবাসের অধিকারই ছিল প্রধান।
পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুরুষ গৃহস্বামী হলেও প্রথম পর্যায়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই গৃহকর্তৃত্বে অংশ নিত। সে সময় নারীরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ছিল। কন্যারা নিজের পছন্দে বিবাহ করতে পারত এবং নারী-পুরুষের মধ্যে একধরনের সাম্যও লক্ষ্য করা যায়।
নারীর অবস্থান ও স্বাধীনতা
ঋগ্বৈদিক যুগে নারীর স্বাধীনতার বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। কিছু নারী যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন—এমন কথাও বেদে উল্লেখ আছে। এক যোদ্ধা নারী বিপলার পা কেটে যাওয়ার পরে অশ্বিন দেবদ্বয়ের দ্বারা কৃত্রিম পা পাওয়ার কাহিনি তার উদাহরণ।
যেসব কন্যা পিতৃগৃহে অবিবাহিত অবস্থায় বার্ধক্যে পৌঁছাত, তাদের বলা হতো ‘কুলপা’ বা ‘অমাজু’। সমাজে তারা সম্পূর্ণ অবহেলিত না হলেও, বিবাহ তখনও বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠেনি—যা পরবর্তী যুগে পরিবর্তিত হয়।
প্রথমদিকের আর্য দেবমণ্ডলীতে ঊষা, সরস্বতী, বাক্, ইলা, ভারতীর মতো দেবীর উপস্থিতি থাকলেও ধীরে ধীরে পুরুষ দেবতাদের প্রাধান্য বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে সমাজেও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিকাশ ঘটে এবং নারীর স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হয়।
বিবাহ, সম্পর্ক ও সামাজিক বাস্তবতা
ঋগ্বৈদিক সমাজে বিবাহের বাইরেও নারী-পুরুষের সম্পর্কের উল্লেখ আছে এবং সমাজ এ বিষয়ে অতিরিক্ত কঠোর ছিল না। বিধবা বিবাহের প্রচলন ছিল, কিন্তু সতী প্রথা বা সহমরণ তখনও ছিল না।
যুদ্ধ ও সংঘর্ষ ছিল সামাজিক বাস্তবতা। সূক্তগুলিতে শত্রুর সর্বনাশ কামনা করে বহু প্রার্থনা আছে, যেখানে ভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি হিংসার প্রকাশ দেখা যায়।
Ariya Jug in Details
জীবন ও মৃত্যুচেতনা
ঋগ্বৈদিক মানুষ সাধারণত দীর্ঘ ও সুখী জীবন কামনা করত। জীবনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আশাবাদী। মৃত্যুর পর স্বর্গ-নরকের ধারণা তখনও সুস্পষ্ট নয়; মৃত্যু মানে ছিল অন্ধকারময় এক অবস্থা। তবু তারা দীর্ঘকাল সূর্যদর্শনের প্রার্থনা বারবার করেছে।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যেও জীবনকে দুঃখময় বলে ত্যাগ করার ধারণা অনুপস্থিত। জীবন ছিল উপভোগ ও আনন্দের বিষয়।
ঋগ্বেদের কাব্যিক সৌন্দর্য ও নারী-পুরুষ সম্পর্ক
ঋগ্বেদের সূক্তে নারী-পুরুষ সম্পর্কের বর্ণনায় এক ধরনের স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত সৌন্দর্য লক্ষ্য করা যায়। ঊষাকে বলা হয়েছে সূর্যের আগে আগমনকারী—অর্থাৎ স্ত্রী সব সময় স্বামীর পশ্চাতে নয়। দেবতাদের শুচিতা বা সৌন্দর্যের তুলনা করা হয়েছে প্রিয় বধূর সঙ্গে। এই উপমাগুলিতে মানবিক আবেগ ও কাব্যিক সতেজতা স্পষ্ট।
দেবকুল ও আর্য সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো
দেবতার শ্রেণীবিন্যাস
ঋগ্বৈদিক যুগে দেবতারা সংখ্যায় বহুবিধ। এদের মধ্যে প্রধান তিনটি শ্রেণি দেখা যায়:
i)প্রাকৃতিক শক্তির দেবতা – সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি, বায়ু, নদী, জল, ঝড় ইত্যাদি।
- ii) প্রাচীন আর্য দেবতা – যাদের সঙ্গে আর্যরা যাত্রা শুরু করেছিল; যেমন ভগ, অংশ, দক্ষ, অযমন, ইলা, ভারতী। এদের পরিচয় ঋগ্বেদে আংশিকভাবে অজানা।
iii) মানবকৃষ্ট বা কীর্তিমান দেবতা – যাদের পূর্বে মানুষ বলে মনে করা হয়েছিল, পরে বিশেষ যোগ্যতার জন্য দেবতায় পরিণত হয়েছেন; যেমন ঋভুরা, অশ্বিনরা, ইন্দ্র।
শেষ পর্যায়ে বিমূর্ত বা প্রায়-বিমূর্ত শক্তিও দেবতারূপে কল্পিত হয়—প্রজাপতি, ব্রহ্মণ, কাল, হিরণ্যগর্ভ, বৃহস্পতি ইত্যাদি।
যজ্ঞ ও ধর্মাচরণের প্রভাব
পশুপালন থেকে চাষে রূপান্তরের সময় আর্যরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। এই সময় পুরোহিতরা যজ্ঞকে জটিল ও বিস্তৃত করে তোলে।
>পুরোহিত ও সহকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
>দক্ষিণার পরিমাণও বাড়তে থাকে।
এটি ঘটে সংহিতার শেষ যুগে এবং সমাজে ধর্মাচরণের জটিলতা বৃদ্ধি পায়।
Ariya Jug in Details
আর্যদের আর্থিক অবস্থা
যজুর্বেদ যুগে সমাজে চারটি বর্ণের উল্লিখিত অবস্থান ছিল:
- ব্রাহ্মণ – শিক্ষা ও শাস্ত্রচর্চা।
- ক্ষত্রিয় – যুদ্ধ ও রক্ষা।
- বৈশ্য – চাষ, পশুপালন ও বাণিজ্য।
- শূদ্র – উচ্চ তিন বর্ণের দাস।
প্রাথমিকভাবে ধনসম্পদের মাপ ছিল পশু, বিশেষত গরু। উৎপাদিত বস্তুর পরিমাণ অনুযায়ী বিনিময়মূলক ব্যবসা হত। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে প্রাথমিক ভেদ লক্ষ্য করা যায়।
ঋগ্বেদে ধনীর ও দরিদ্রের চিত্র:
- ধনী: মূল্যবান উপহার, সোনার গয়না, গুপ্তধন।
- দরিদ্র: প্রাথমিক খাদ্য হিসেবে কুকুরের মাংস বা নাড়িভুঁড়ি খাওয়া।
- অপরাধও দেখা যেত, যেমন চুরি, প্রতারণা, শত্রুপীড়ন।
পারিবারিক জীবন ও সামাজিক কাঠামো
- পরিবার বা কুলে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে ছিলেন সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ।
- মেয়েরা তুলনামূলকভাবে কিছু স্বাধীনতা পেত।
- বিবাহের বাইরেও সম্পর্ক ঘটত; বিধবা বিবাহ প্রচলিত ছিল, তবে সহমরণ (সতী) ছিল না।
- পরিবারে ক্ষমতা ও সম্মান বয়স ও সম্পর্ক অনুযায়ী বণ্টিত হতো।
অর্থাৎ সমাজ ছিল গ্রামভিত্তিক ও কৌমিক, যেখানে সকলের জীবিকা ও নিরাপত্তা নিত্যপ্রয়োজনীয় পেশা ও পশুপালনের ওপর নির্ভর করত।