জৈন ও বৌদ্ধধর্ম
History of Budha and Jain পরীক্ষার জন্য ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা RRB NTPC, SSC, UPSC এবং সরকারি পরীক্ষায় ভালো স্কোর করতে সহায়তা করে। আজকে ইতিহাসের একটি বিষয় জৈন ও বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হল যা পড়লে আর্য যুগ থেকে আসা যেকোনো প্রশ্নের উত্তর করা যাবে ।
তোমরা বিষয় টি ভালো করে পড় । আশা করি এই বিষয়টি পড়লে জৈন ও বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে তোমাদের একটি ভালো ধারনা হয়ে যাবে । এছাড়া আমাদের এখানে অন্যান্য বিষয়ের নোট্স দেওয়া আছে চাইলে দেখে নিতে পার ।
বেদবিরোধী ধর্মধারা: জৈন ও বৌদ্ধধর্ম
প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে বেদকেন্দ্রিক যজ্ঞধর্মের পাশাপাশি ধীরে ধীরে এক বিকল্প চিন্তাধারার জন্ম হয়। এই নতুন ধারাকেই বলা হয় বেদবিরোধী ধর্মধারা। এর মধ্যে জৈন ও বৌদ্ধধর্ম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী।
বেদবিরোধী চিন্তার ঐতিহাসিক পটভূমি
ঋগ্বেদের যুগ থেকেই ভারতের সমাজে কিছু মানুষ সংসারত্যাগী ও সন্ন্যাসী জীবনের অনুশীলন করতেন। সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত যোগাসনে বসা মূর্তি এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। ঋগ্বেদেও ‘যতি’ ও ‘মুনি’-দের উল্লেখ রয়েছে, যারা মূলধারার বৈদিক যজ্ঞে অংশ নিতেন না।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধ তাঁর সাধনার সময় আরাড় কালাম, রুদ্রক রামপুত্র, নির্গ্রন্থ জ্ঞাতপুত্র (মহাবীর), অজিত কেশকম্বলী, পূরণ কাশ্যপ ও মস্করী গোশালের মতো বহু ধর্মগুরুর সংস্পর্শে আসেন। এঁদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব দর্শন ও অনুগামী ছিল। এর থেকেই বোঝা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম–সপ্তম শতক থেকেই ভারতবর্ষে বহু অ-বৈদিক সন্ন্যাসী সম্প্রদায় সক্রিয় ছিল।
History of Budha and Jain
কেন মানুষ বেদবিরোধী ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়?
সাধারণ মানুষ লক্ষ্য করেছিল—
>যজ্ঞ ও বেদচর্চা ছাড়াও নৈতিক জীবন সম্ভব
>যজ্ঞ করলেও সব সময় কাম্য ফল পাওয়া যায় না
>দরিদ্র, শূদ্র ও নারীরা বৈদিক ধর্মাচরণে সমান অধিকার পায় না
ফলে সমাজের বৃহৎ অংশ বিকল্প ধর্মপথের সন্ধান করে এবং বিভিন্ন বেদবিরোধী সম্প্রদায়ে যোগ দেয়।
বেদবিরোধী ধর্মধারার প্রধান শাখা
প্রাচীন ভারতে বেদবিরোধী ধর্মের প্রধান তিনটি ধারা ছিল—
>জৈনধর্ম
>বৌদ্ধধর্ম
>আজীবিক ধর্ম
এই তিনটির মধ্যে জৈনধর্ম সর্বপ্রাচীন, এবং মহাবীর বুদ্ধের আগেই এর প্রচার শুরু হয়।
History of Budha and Jain
জৈনধর্মের মূল নীতি ও দর্শন
জৈনধর্ম প্রথম সুস্পষ্টভাবে বর্ণভেদ ও যজ্ঞপ্রথার বিরোধিতা করে। এই ধর্মের কেন্দ্রীয় নীতিগুলি হল—
- অহিংসা
- সত্যবাদিতা
- অচৌর্য (চুরি না করা)
- অপরিগ্রহ (সম্পত্তি সঞ্চয় বর্জন)
- ব্রহ্মচর্য
প্রথম চারটি নীতি প্রাচীনকাল থেকেই পরিচিত ছিল, কিন্তু ব্রহ্মচর্যকে কঠোর ধর্মীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন মহাবীর।
জৈনধর্মে দেবতার ভূমিকা গৌণ। এখানে সর্বোচ্চ স্থান লাভ করেন জিন, অর্থাৎ যিনি আত্মসংযম ও সাধনার মাধ্যমে মুক্তি অর্জন করেছেন।

ত্রিরত্ন: জৈন মুক্তির পথ
জৈনধর্ম অনুযায়ী আত্মমুক্তি অর্জিত হয় তিনটি মূল সাধনার মাধ্যমে, যাকে বলা হয় ত্রিরত্ন—
>সম্যক জ্ঞান
>সম্যক দর্শন
>সম্যক চরিত্র
এই তিনটির সম্মিলনেই আত্মা বন্ধনমুক্ত হয়—এটাই জৈন দর্শনের মূল কথা।
History of Budha and Jain
জৈন সাহিত্য, ভাষা ও অর্থনৈতিক জীবন
জৈন ধর্মগ্রন্থ ও সাহিত্য রচিত হয় অর্ধমাগধী প্রাকৃত ভাষায়, যা সংস্কৃতের তুলনায় সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বেশি বোধগম্য ছিল। এর ফলে জৈন ধর্ম দ্রুত সাধারণ সমাজে বিস্তার লাভ করে।
অহিংসা নীতির কারণে জৈনরা যুদ্ধ ও কৃষিকাজ থেকে দূরে থাকে। কীটপতঙ্গ হত্যার আশঙ্কায় তারা জমি চাষে অনীহা প্রকাশ করে। তাই ব্যবসা ও বাণিজ্যই জৈনদের প্রধান জীবিকা হয়ে ওঠে।
জৈনধর্মের বিস্তার ও অবদান
জৈনধর্ম প্রথমে উত্তর ভারতে প্রসার লাভ করে এবং পরে কলিঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অনন্য মন্দির, ভাস্কর্য ও স্থাপত্য নিদর্শন নির্মাণ করে প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলাকে সমৃদ্ধ করেছে।
বৌদ্ধধর্ম: দর্শন, বিস্তার ও সমাজে প্রভাব
প্রাচীন ভারতের বেদবিরোধী ধর্মধারার মধ্যে বৌদ্ধধর্ম সর্বাধিক বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিক প্রভাবসম্পন্ন একটি ধর্ম। গৌতম বুদ্ধ মানুষের দুঃখের কারণ বিশ্লেষণ করে এক নতুন নৈতিক ও দার্শনিক পথের দিশা দেন, যা যজ্ঞকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বৌদ্ধধর্মের মূল দর্শন
বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্রীয় বক্তব্য হল—
মানুষের দুঃখ ও পাপের মূল কারণ তৃষ্ণা বা বাসনা। এই তৃষ্ণা থেকেই জন্ম হয় কর্ম, পুনর্জন্ম ও দুঃখের চক্রের। অন্তরের বাসনা সম্পূর্ণভাবে দূর করতে পারলেই মানুষ পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে নির্বাণ লাভ করতে পারে।
History of Budha and Jain
অষ্টাঙ্গ মার্গ: নির্বাণ লাভের পথ
নির্বাণে পৌঁছানোর জন্য বুদ্ধ যে পথ নির্দেশ করেছেন, তাকে বলা হয় অষ্টাঙ্গ মার্গ বা আটটি নীতি—
- সম্যক দর্শন
- সম্যক সংকল্প
- সম্যক বাক্য
- সম্যক কর্ম
- সম্যক জীবিকা
- সম্যক প্রচেষ্টা
- সম্যক স্মৃতি
- সম্যক ধ্যান
এই নীতিগুলি মূলত সন্ন্যাসী সংঘের জন্য প্রণীত হলেও গৃহস্থ মানুষও এগুলি অনুসরণ করতে পারে।
বৌদ্ধ সংঘ, শিল্প ও স্থাপত্য
বৌদ্ধধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের নানা স্থানে গড়ে ওঠে—
>বিহার
>চৈত্য
>স্তূপ
>সঙ্ঘারাম
এগুলিতে বৌদ্ধ শিল্পকলা ও ভাস্কর্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়। বুদ্ধের জীবনী ও সামাজিক ঘটনাবলির চিত্রণ এই সময়ে উচ্চ শৈল্পিক মানে পৌঁছায়।
বৌদ্ধধর্মের আন্তর্জাতিক বিস্তার
এক সময় বৌদ্ধধর্ম ভারতের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে—
>শ্রীলঙ্কা
>ব্রহ্মদেশ (মায়ানমার)
>ইন্দোনেশিয়া
>মালয়েশিয়া
>চিন
>কোরিয়া
>জাপান
>তুরস্ক
বর্তমানে ভারতে বৌদ্ধের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও এই দেশগুলিতে বৌদ্ধধর্ম এখনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
History of Budha and Jain
বৌদ্ধ সাহিত্যের বিকাশ ও মহাযান–হীনযান বিভাজন
বুদ্ধের মৃত্যুর বহু পরে বৌদ্ধধর্ম দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়—
হীনযান (প্রাচীন পথ)
মহাযান (পরবর্তী বিস্তৃত পথ)
মহাযান শাখায় বিপুল সাহিত্য রচিত হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছরে বিভিন্ন ভাষায় এক বিশাল বৌদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার গড়ে ওঠে, যা এশিয়ার বহু অঞ্চলে বিস্তৃত।
অহিংসা ও সমাজ সংস্কারে বৌদ্ধধর্মের ভূমিকা
সহিংস যজ্ঞকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিপরীতে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম সমাজে এক প্রবল অহিংসার ধারা প্রবাহিত করে। এই ধর্মগুলি—
>যজ্ঞপ্রথার বিরোধিতা করে
>জাতিভেদের ভিত্তিকে দুর্বল করে
>মানবিক নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়
এর প্রভাব স্থান ও কালের সীমা ছাড়িয়ে বহু বিস্তৃত হয়।
ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতিক্রিয়া: আশ্রম ব্যবস্থার পুনর্গঠন
বৌদ্ধ ও জৈনদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ব্রাহ্মণ্য সমাজ শঙ্কিত হয়। তখন তারা একটি সমন্বয়মূলক পথ গ্রহণ করে। জীবনের চারটি আশ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়—
- ব্রহ্মচর্য
- গার্হস্থ্য
- বানপ্রস্থ
- সন্ন্যাস
বানপ্রস্থে অল্প উপকরণে সামান্য যাগের বিধান রাখা হয় এবং সন্ন্যাসে যজ্ঞ পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়। এর ফলে বেদবিরোধী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংঘাত অনেকটাই কমে আসে।
জ্ঞানমার্গের উত্থান ও যজ্ঞের গুরুত্ব হ্রাস
এই সময় থেকেই ব্রাহ্মণ্য ধর্মও ধীরে ধীরে কর্মকাণ্ড থেকে জ্ঞানমার্গে ঝুঁকে পড়ে। যদিও ধনী ও প্রভাবশালীরা দীর্ঘকাল যজ্ঞ চালিয়ে যায়, তবু সমাজে যজ্ঞবিরোধী মনোভাব স্বীকৃতি পায়।
খ্রিস্টপূর্ব ৭ম–৫ম শতক: বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় আন্দোলনের যুগ
এই সময়কাল শুধু ভারতেই নয়, গ্রিস, রোম, চিন, মিশর ও ইরানেও গভীর ধর্মীয় ও দার্শনিক আলোড়নের যুগ ছিল। ভারতবর্ষে এই আন্দোলনের প্রভাব বিশেষভাবে তীব্র হয়ে ওঠে।
History of Budha and Jain
সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন
বুদ্ধের সময়ে সমাজে বহু পরিবর্তন দেখা যায়—
>গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজ ভেঙে ‘কুল’ বা যৌথ পরিবার গড়ে ওঠে
>বৈশ্য শ্রেণির গুরুত্ব বাড়ে
>বাণিজ্য ও ব্যবসায় বৈশ্যদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়
>জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম বণিকদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে
জৈন ও বৌদ্ধ স্তূপ, বিহার ও চৈত্য নির্মাণে বণিকদের আর্থিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
মুদ্রা, লিপি ও শ্রেণিবিন্যাসের পরিবর্তন
>খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকেই—
>খরোষ্ঠী ও ব্রাহ্মী লিপির প্রচলন
>ছাপচিহ্নিত রৌপ্য মুদ্রার ব্যবহার
>রাজস্ব, বেতন ও জরিমানায় মুদ্রার প্রয়োগ শুরু হয়
ব্রহ্মত্র ও দেবত্র সম্পত্তি করমুক্ত থাকায় বৈশ্যদের ওপর করের চাপ বাড়ে। ফলে তারা কৃষি ও পশুপালন ছেড়ে বাণিজ্যে ঝুঁকে পড়ে। কৃষি, পশুপালন ও কুটিরশিল্প ক্রমে শূদ্রদের হাতে চলে যায়।